মাহবুব সরদার সবুজ | Mahbub Sardar Sabuj

হাতকড়ায় চেয়ারম্যান: খোশবাসে বেদনা, অনিশ্চয়তায় জনজীবন

|

হাতকড়ায় চেয়ারম্যান: খোশবাসে বেদনা, অনিশ্চয়তায় জনজীবন

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার খোশবাস ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নাজমুল হাসান সর্দারের গ্রেফতারের ঘটনায় জনজীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ।

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার খোশবাস ইউনিয়নে যেন এক বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে। জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ আজ অনেকটাই থমকে গেছে, আর এই অচল অবস্থার মূলে রয়েছেন ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান নাজমুল হাসান সর্দার।\n\nযিনি একসময় জনগণের আস্থা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে জননেতার আসনে বসেছিলেন, আজ তাকেই দেখা যাচ্ছে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায়। এই দৃশ্য কেবল তার পরিচিতজনদের নয়, সমগ্র খোশবাসবাসীর হৃদয়ে এক গভীর বেদনা আর অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।\n\nচার মাস পূর্বে রাজনৈতিক মামলায় কারাভোগ শেষে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি। জেল থেকে বেরিয়ে এলেও তার জীবন আর আগের মতো স্বাভাবিক হয়নি।\n\nগত ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি ইউনিয়ন পরিষদে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। রাজনৈতিক চাপ আর নানামুখী অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আটকা পড়েছিল তার জীবন।\n\nএই দীর্ঘ সময়টা তিনি কাটিয়েছেন একরকম স্বেচ্ছা নির্বাসনে, যেখানে জনপ্রতিনিধি হয়েও জনগণের থেকে দূরে থাকতে হয়েছে তাকে। চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলেছেন প্যানেল চেয়ারম্যান আয়েত আলী।\n\nপরিষদ তার কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও সাধারণ মানুষের মনে ছিল এক গভীর শূন্যতা। কারণ, তারা তাদের নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিকেই দেখতে চেয়েছিল পরিষদের চেয়ারে।\n\nজনপ্রতিনিধি যখন জনগণের কাছে অদৃশ্য থাকেন, তখন সেবার মান এবং জনগণের আস্থা – উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খোশবাসের মানুষও এই শূন্যতা অনুভব করছিল প্রতি মুহূর্তে।\n\nতবে এই স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখতে শুরু করেছিলেন নাজমুল হাসান সর্দার। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের হারানো দায়িত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি উদ্যোগী হন।\n\nহাইকোর্ট থেকে তার পক্ষে একটি রুল জারি হয়, যা তাকে পুনরায় পরিষদে বসার পথ খুলে দেয়। এই সুসংবাদে তিনি নতুন করে উজ্জীবিত হন।\n\nস্থানীয় পর্যায়ে তিনি যোগাযোগ বাড়াতে শুরু করেন, মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে তাদের সমস্যার কথা শোনেন এবং পুনরায় স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। খোশবাসবাসীর মনেও এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল যে, তাদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আবার ফিরছেন।\n\nকিন্তু সেই আশার আলো খুব বেশিদিন জ্বলতে পারেনি। গত ২৯ মার্চ খোশবাস ইউনিয়ন পরিষদ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়।\n\nএকটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরিষদ কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এই অপ্রত্যাশিত বাধা চেয়ারম্যান নাজমুল হাসান সর্দারের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।\n\nএই সময়টাতে তার শারীরিক অবস্থাও ভালো ছিল না। তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে একাধিক ব্যাগ রক্ত দিতে হয়।\n\nঅসুস্থ শরীর নিয়েও তাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। শারীরিক ও মানসিক এই দ্বৈত ধকল তার জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।\n\nঅবশেষে সেই কঠিন মুহূর্তটি আসে। গত ৩০ মার্চ কুমিল্লা আদালতে একটি আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত মামলায় হাজিরা দিতে গেলে সেখান থেকেই তাকে গ্রেফতার করা হয়।\n\nঅভিযোগ ছিল—ইট ক্রয় সংক্রান্ত টাকার বিষয়ে প্রতারণা। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, অভিযোগকারী ব্যক্তি তার পরিচিতজন বলেই জানা গেছে।\n\nএই গ্রেফতারের ঘটনা খোশবাস ইউনিয়নে এক গভীর শোকের ছায়া নামিয়ে আনে। গ্রেফতারের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে চেয়ারম্যান নাজমুল হাসান সর্দারের হাতকড়া পরিহিত একটি ভিডিও।\n\nসেই ভিডিওতে দেখা যায় একজন ক্লান্ত, বিষণ্ণ মানুষকে, যার চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে হতাশা আর একরাশ অনিশ্চয়তা। এই ভিডিওটি অসংখ্য মানুষের মনে গভীর আবেগ তৈরি করেছে—কেউ বিস্মিত হয়েছেন এই ঘটনায়, কেউবা নীরব থেকেছেন বেদনার্ত হৃদয়ে।\n\nএকজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির এমন পরিণতি মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে খোশবাসবাসীর। বর্তমানে খোশবাস ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে।\n\nচেয়ারম্যানের অনুপস্থিতি এবং প্যানেল চেয়ারম্যানের সীমিত ক্ষমতা—সব মিলিয়ে পরিষদ তার স্বাভাবিক সেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশন সনদ, বিভিন্ন প্রকার নাগরিক সনদপত্রসহ প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।\n\nতাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এই ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি সমগ্র খোশবাস এলাকার প্রশাসনিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।\n\nতারা দ্রুত এই সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে জনসেবা পুনরায় স্বাভাবিক হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘব হয়। খোশবাসের মানুষ এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।\n\nতারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে—কখন এই স্থবিরতা কাটবে, কখন তাদের ইউনিয়ন পরিষদ আবার সচল হবে, আর কখন ফিরবে তাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। এই অপেক্ষার পালা কবে শেষ হবে, তা বলা মুশকিল।\n\nতবে খোশবাসবাসীর মনে একটাই প্রত্যাশা, দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হোক এবং তাদের প্রিয় ইউনিয়ন আবার তার নিজস্ব গতি ফিরে পাক।

লেখক:

সরদার সংবাদ | Sardar Sangbad