মাহবুব সরদার সবুজ | Mahbub Sardar Sabuj

ঠিকমতো বাংলা রিডিং পড়তে পারে না, অথচ বসে আছেন এমপি–মন্ত্রী পদে।

|

ঠিকমতো বাংলা রিডিং পড়তে পারে না, অথচ বসে আছেন এমপি–মন্ত্রী পদে।

একজন মন্ত্রী যদি প্রকাশ্যে ঠিকভাবে লিখিত বক্তব্যও পড়তে না পারেন, তা শুধু ব্যক্তিগত অদক্ষতার পরিচয় নয়, বরং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্যও বিব্রতকর।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ এবং শাসন পরিচালনায় অংশ নেন।\n\nকিন্তু যখন এই জনপ্রতিনিধিদের যোগ্যতা ও দক্ষতার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন তা কেবল ব্যক্তিবিশেষের ব্যর্থতা নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি, একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের প্রকাশ্যে ঠিকমতো বাংলা রিডিং পড়তে না পারার ঘটনাটি সেই উদ্বেগেরই প্রতিচ্ছবি।\n\nএটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অদক্ষতার পরিচায়ক নয়, বরং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্যও অত্যন্ত বিব্রতকর। আজকের এই ডিজিটাল যুগে, যখন তথ্যপ্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো ঘটনা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়, তখন এমন দুর্বলতা আড়াল করার কোনো সুযোগ নেই।\n\nসংসদের প্রতিটি বিতর্ক, মন্ত্রীদের প্রতিটি বক্তব্য এখন শুধু দেশের মানুষই নয়, সারা বিশ্বের মানুষও দেখে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও এসব ঘটনাকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরে।\n\nএমন পরিস্থিতিতে, একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির যদি নিজের মাতৃভাষা বাংলা সঠিকভাবে পাঠ করতে সমস্যা হয়, তাহলে তা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির মান নিয়েও প্রশ্ন তোলে।\n\nএকজন জনপ্রতিনিধি, যিনি দেশের আইন প্রণেতা এবং জনগণের প্রতিনিধি, তাঁর কাছ থেকে ন্যূনতম কিছু দক্ষতা আশা করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো মাতৃভাষা বাংলায় নির্ভুলভাবে পড়তে ও বলতে পারা।\n\nকারণ, দেশের অধিকাংশ আইন, নীতি, এবং সরকারি নথি বাংলাতেই রচিত হয়। যদি একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য এই নথিগুলো সঠিকভাবে পড়ে বুঝতে না পারেন, তাহলে তাঁর পক্ষে কিভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব?\n\nকিভাবে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগণের দাবি-দাওয়া, অভিযোগ বা সমস্যাগুলো সঠিকভাবে উপলব্ধি করে সংসদে উপস্থাপন করবেন? এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এক বিরাট অন্তরায়।\n\nসবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এমন সুস্পষ্ট ব্যর্থতা চোখে পড়ার পরও একশ্রেণির মানুষ অন্ধ সমর্থনে ব্যস্ত থাকে। তারা যুক্তিহীনভাবে এসব অদক্ষতাকে আড়াল করার চেষ্টা করে, এমনকি অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রমণ করেও বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে চায়।\n\nএই ধরনের অন্ধ সমর্থন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধির কাজ জনগণের সেবা করা, কোনো ব্যক্তির পূজা করা নয়।\n\nজনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য এবং নাগরিকদের অধিকার। যখন এই জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।\n\nরাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় যোগ্যতার চেয়ে অন্য বিষয়গুলোকে বেশি প্রাধান্য দেয়। অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি বা বংশগত পরিচয় অনেক সময় শিক্ষাগত যোগ্যতা বা দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।\n\nএর ফলস্বরূপ, অযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়ে আসেন, যা দেশের সার্বিক উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো, জনগণের মধ্য থেকে যোগ্যতম ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা, যিনি জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবেন এবং দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবেন।\n\nনেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের যোগ্যতা, প্রস্তুতি ও দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্র গড়ে ওঠে।\n\nযখন নাগরিকরা তাদের প্রতিনিধিদের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তা সরকার এবং জনপ্রতিনিধিদের জন্য এক ধরনের সতর্কতা হিসেবে কাজ করে। এটি তাঁদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে এবং নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করে।\n\nরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বারবার অদক্ষতার পরিচয় দেওয়া দেশের জন্য সত্যিই লজ্জার। এই লজ্জা কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নয়, বরং সমগ্র জাতির।\n\nএই সমস্যা সমাধানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়াতে আরও বেশি স্বচ্ছতা এবং কঠোরতা আনতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, ভাষাগত দক্ষতা এবং জনসেবার মানসিকতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।\n\nপাশাপাশি, জনগণেরও সচেতন হতে হবে। ভোট দেওয়ার সময় প্রার্থীর যোগ্যতা, দক্ষতা এবং অতীত রেকর্ড যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।\n\nশুধুমাত্র আবেগ বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে ভোট না দিয়ে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে যোগ্যতম প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে হবে। গণতন্ত্রে জনগণের অংশগ্রহণ এবং সচেতনতাই পারে এমন অদক্ষতা দূর করতে।\n\nসংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে জনপ্রতিনিধিদের যোগ্যতার মান উন্নত করা অপরিহার্য। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং দেশের সম্মান, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত এক গভীর সংবেদনশীল বিষয়।\n\nআমাদের মনে রাখতে হবে, একটি যোগ্য নেতৃত্বই পারে দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। তাই, এই ধরনের অদক্ষতাকে কেবল সমালোচনা না করে, এর মূল কারণগুলো খুঁজে বের করে কার্যকর সমাধানের পথ বের করা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক:

সরদার সংবাদ | Sardar Sangbad