মাহবুব সরদার সবুজ | Mahbub Sardar Sabuj

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালী নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

|

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালী নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও হরমুজ প্রণালী, নিষেধাজ্ঞা ও সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বরাবরই এক জটিল ধাঁধার মতো। আর এই ধাঁধার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ইরান।\n\nসাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পর এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখনো অনিশ্চয়তার ঘন কালো মেঘে ঢাকা। এই অঞ্চলের প্রতিটি কোণে এখন চাপা উত্তেজনা, প্রতিটি পদক্ষেপে লুকিয়ে আছে নতুন সংঘাতের সম্ভাবনা।\n\nযুদ্ধবিরতি যদিও একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস এনেছে, তবে এটি যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কাই প্রবল। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চলছে, যা একটি ইতিবাচক দিক।\n\nতবে এই আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। কারণ, হরমুজ প্রণালী, ইরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশের সামরিক উপস্থিতি – এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতপার্থক্য এখনো আকাশচুম্বী।\n\nএই মৌলিক বিরোধগুলো নিষ্পত্তি না হলে স্থায়ী শান্তি স্থাপন প্রায় অসম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালী।\n\nএটি কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির ধমনী। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।\n\nযুদ্ধবিরতির পরও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ইরান এই প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ অথবা নতুন করে ফি আদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে খবর পাওয়া গেছে।\n\nযদি এটি বাস্তবায়িত হয়, তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক নতুন অস্থিরতা তৈরি হবে, যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হবে। তেলের দামের উর্ধ্বগতি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং অর্থনৈতিক মন্দার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।\n\nএই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অতীতেও বহুবার উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, এবং বর্তমান পরিস্থিতি আবারও সেই আশঙ্কাই জাগিয়ে তুলছে। অভ্যন্তরীণভাবেও ইরান এক কঠিন সময় পার করছে।\n\nদীর্ঘদিনের সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্বাসন এবং দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখা এখন ইরানের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।\n\nএকই সঙ্গে, অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং বিরোধী সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।\n\nভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর কঠোরতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ এবং রাজনৈতিক বন্দীদের সংখ্যা বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো সীমিত, তবে এই ধরনের খবর দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কেড়েছে।\n\nশুধু ইরান নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলেও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।\n\nযুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও, ইসরায়েল-লেবানন সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতিতে ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক শক্তিগুলো, যেমন হিজবুল্লাহ, আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।\n\nএর ফলে ইসরায়েল এবং লেবাননের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যাবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য এক নতুন এবং ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করবে। এই ধরনের সংঘাত দ্রুতই আঞ্চলিক রূপ নিতে পারে এবং তাতে অন্যান্য দেশও জড়িয়ে পড়তে পারে।\n\nমধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা কেবল আঞ্চলিক নয়, এর বৈশ্বিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।\n\nতাই এই অঞ্চলের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইরানকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কেবল সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাই বাড়াচ্ছে না, বরং অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটেরও জন্ম দিচ্ছে।\n\nএই জটিল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর এবং সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা আরও গভীর হতে পারে এবং তার মাশুল দিতে হতে পারে বিশ্বকে।

লেখক:

সরদার সংবাদ | Sardar Sangbad