অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই, এই আলোচনা এখন আর কেবল অর্থনীতিবিদদের গোলটেবিল বৈঠকেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পৌঁছে গেছে নীতি-নির্ধারকদের দোরগোড়ায়। ঢাকা শহরে এখন যে নতুন করে অর্থনীতি ও নীতিগত সংস্কার নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে, তা এক সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে।\n\nদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক গতিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে অব্যাহত সংস্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে মানবদেহের রক্তসঞ্চালনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।\n\nতাঁর এই উপমা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানবদেহে রক্তসঞ্চালন যেমন জীবনের স্পন্দনকে সচল রাখে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে সংস্কারও ঠিক তেমনই প্রাণবন্ত রাখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে।\n\nড. ভট্টাচার্যের মতে, টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। এই তিনটি স্তম্ভই একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে।\n\nধারাবাহিকতা না থাকলে নীতিগুলো কার্যকর হয় না, স্বচ্ছতা না থাকলে দুর্নীতি জেঁকে বসে এবং বাস্তবমুখী পদক্ষেপের অভাব হলে নীতিগুলো জনজীবনে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি এক অভূতপূর্ব অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।\n\nরাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, যা মূল্যস্ফীতির উর্ধ্বগতিতে প্রকট হয়ে উঠেছে।\n\nএই মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। একইসঙ্গে, বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কায় বিদেশি বিনিয়োগেও এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।\n\nএমন এক জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটতে হবে। এই কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো হতে পারে রাজস্ব নীতিতে সংস্কার, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়া।\n\nব্যবসায়ী মহলও এই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। তাদের মতে, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি সাধন করা গেলে তা দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং উৎপাদন খাতে এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।\n\nএকটি অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ বলতে বোঝায়, সহজ লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া, অবকাঠামোগত সুবিধা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কর কাঠামোর সরলীকরণ। যখন বিনিয়োগকারীরা একটি নিরাপদ ও লাভজনক পরিবেশ দেখতে পান, তখন তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন, যা নতুন নতুন শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।\n\nঅন্যদিকে, সাম্প্রতিক সরকারি প্রতিবেদনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতিতে উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই সংবাদ নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।\n\nবৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক। এটি আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।\n\nরিজার্ভে উন্নতির এই ইঙ্গিত অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই ইতিবাচক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সংস্কার প্রক্রিয়া কোনোভাবেই থামানো যাবে না।\n\nবরং এই সুযোগটিকে আরও বড় পরিসরে সংস্কারের জন্য ব্যবহার করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবেলা করার সক্ষমতা তৈরি হয়। অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি কেবল কিছু নীতির পরিবর্তন নয়, এটি একটি সামগ্রিক মানসিকতার পরিবর্তন।\n\nএর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সংস্কারের মাধ্যমে দুর্বল খাতগুলোকে শক্তিশালী করা যায় এবং নতুন নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা যায়।\n\nউদাহরণস্বরূপ, যদি ব্যাংক খাতের সংস্কার করা হয়, তাহলে খেলাপি ঋণের বোঝা কমে আসবে, ব্যাংকগুলো আরও বেশি ঋণ দিতে সক্ষম হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পেয়ে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবেন। একইভাবে, যদি কর কাঠামোতে সংস্কার আনা হয়, তাহলে করের বোঝা কমে আসবে, করদাতার সংখ্যা বাড়বে এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে, যা সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা সম্ভব হবে।\n\nশুধু তাই নয়, প্রযুক্তিগত সংস্কারও বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রসার, ই-কমার্স এবং অনলাইন সেবার মানোন্নয়ন অর্থনীতির চাকাকে আরও গতিশীল করতে পারে।\n\nএর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং দেশের তরুণ প্রজন্মকে আরও বেশি আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করবে। পরিশেষে বলা যায়, অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।\n\nএটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা কখনো থামিয়ে রাখা উচিত নয়। বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করা প্রয়োজন।\n\nনীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী মহল, অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণ জনগণ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনীতির স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।
অর্থনীতি সচল রাখতে সংস্কারে জোর, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
|
অর্থনীতিকে সচল রাখতে নীতিগত সংস্কার, স্বচ্ছতা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
লেখক: মাহবুব সরদার সবুজ
সরদার সংবাদ | Sardar Sangbad