মাহবুব সরদার সবুজ | Mahbub Sardar Sabuj

মাহবুব সরদার সবুজ

জীবনদর্শন |

০১. ভুলে যাওয়ার রোগ চাই আমি ভুলে যেতে চাই তোমাকে, কিন্তু স্মৃতি তো মানুষের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সঙ্গী। সে তোমাকে ফিরিয়ে আনে প্রতিটি রাতে, প্রতিটি নির্ঘুম প্রহরে। আমি চোখ বন্ধ করলে তোমার মুখটা ফুটে ওঠে, চোখ খুললে তোমার শূন্যতা দেখি। কী অদ্ভুত এই খেলা—যাকে ভুলতে চাই, সে-ই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। মানুষ বলে সময় সব ভুলিয়ে দেয়, কিন্তু আমার সময়টা বোধহয় থমকে গেছে। সে এগোয় না, সে শুধু তোমার চারপাশে ঘুরপাক খায়। আমি একদিন হয়তো ভুলব, হয়তো ভুলব না—কিন্তু চেষ্টাটা আমি ছাড়ব না। তোমাকে মনে রাখাটা যদি আমার শাস্তি হয়, তাহলে আমি সেই শাস্তি মাথা পেতে নেব। কিন্তু আর কাঁদব না তোমার জন্য, এই প্রতিজ্ঞা আমি নিজেকে দিয়েছি। আমি জানি প্রতিজ্ঞা ভাঙবে, আবার করব, আবার ভাঙবে। তবুও একদিন না একদিন আমি পারব—তোমাকে ছাড়াও বাঁচতে পারব। সেদিন আমি নিজেকে নতুন করে চিনব, নতুন করে ভালোবাসব। ০২. মায়ের হাতের উষ্ণতা যেন মায়ের হাতের উষ্ণতা পৃথিবীর কোনো কিছুতেই পাওয়া যায় না। যখন সারা পৃথিবী আমাকে ফেলে দিয়েছে, মা তখনও আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছেন—আমি আছি, ভয় কিসের? এই একটা কথায় আমার ভেতরের সব ঝড় শান্ত হয়ে যায়। মানুষ বলে ভালোবাসা শর্তহীন হয় না, আমি বলি—মায়ের ভালোবাসা দেখেছ? সন্তান যতই অকৃতজ্ঞ হোক, মা কোনোদিন তাকে ত্যাগ করেন না। আমি পৃথিবীর সব সম্পর্কে হেরে গেছি, কিন্তু মায়ের কাছে আমি সবসময় জয়ী। মা আমার দুর্বলতাগুলো জানেন, তবুও আমাকে শক্তিশালী ভাবেন। মা আমার ভুলগুলো দেখেন, তবুও আমাকে সেরা মনে করেন। এই পৃথিবীতে যদি কাউকে সত্যিকারের ফেরেশতা বলতে হয়, সেটা আমার মা। আমি তাঁর ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না, শুধু চেষ্টা করে যেতে পারি। আল্লাহ, আমার মাকে সুস্থ রাখো, তাঁকে দীর্ঘায়ু দাও—এটুকুই আমার সবচেয়ে বড় দোয়া। ০৩. তুমি ছিলে আমার ভুল তুমি ছিলে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ভুল। সুন্দর, কারণ তোমার সাথে কাটানো দিনগুলো ছিল স্বপ্নের মতো। ভুল, কারণ সেই স্বপ্ন কোনোদিন সত্যি হওয়ার ছিল না। আমি জেনেশুনে আগুনে হাত দিয়েছিলাম, পুড়েছি—এটা আমার নিজের দোষ। তোমাকে দোষ দেওয়ার কোনো অধিকার আমার নেই। তুমি কোনোদিন বলোনি আমাকে ভালোবাসো, আমিই নিজের মনে গল্প সাজিয়েছিলাম। সেই গল্পের নায়ক তুমি ছিলে, কিন্তু তুমি জানতেই না তুমি কারও গল্পে আছ। এখন সেই গল্পটা আমি বন্ধ করে দিয়েছি, কারণ একতরফা গল্প বেশিদূর যায় না। আমি এখন নতুন গল্প লিখব, যেখানে নায়িকা আমি নিজেই। সেই গল্পে কোনো নায়কের দরকার নেই, আমি একাই যথেষ্ট। আমি নিজের হাতে নিজের ভাগ্য লিখব, কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকব না। এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত, আর এই সিদ্ধান্ত থেকে আমি পিছু হটব না। ০৪. সবাই চলে যায় একদিন সবাই চলে যায়—এটা জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য। যাকে তুমি নিজের ভাবো, সে-ই একদিন সবচেয়ে দূরের মানুষ হয়ে যায়। আমি এই সত্যটা মেনে নিতে পারতাম না আগে, এখন পারি। কারণ আমি বুঝে গেছি—মানুষ স্থায়ী নয়, সম্পর্কও স্থায়ী নয়। স্থায়ী শুধু আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক, বাকি সব ক্ষণিকের। তুমি চলে গেছ, আগামীকাল হয়তো আরও কেউ যাবে। আমি আর কাউকে আটকে রাখার চেষ্টা করব না। যে যেতে চায়, তাকে যেতে দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। আমি এখন এই দর্শনটা মেনে চলি—ধরে রাখো না, ছেড়ে দাও। ছেড়ে দিলে যদি ফিরে আসে, তাহলে সে তোমার ছিল। আর যদি না আসে, তাহলে সে কোনোদিনই তোমার ছিল না। তুমি ফিরে আসোনি, তাই আমি বুঝে গেছি—তুমি আমার ছিলে না কোনোদিন। ০৫. আল্লাহর পরিকল্পনা সবচেয়ে সুন্দর আমি চেয়েছিলাম তুমি আমার হও, কিন্তু আল্লাহ চাননি। আমি রাগ করেছিলাম তাকদীরের ওপর, কেঁদেছিলাম রাতের পর রাত। কিন্তু এখন বুঝেছি—আল্লাহর পরিকল্পনা সবচেয়ে সুন্দর। তিনি আমাকে তোমার কাছ থেকে সরিয়ে এনেছেন, কারণ তুমি আমার জন্য ক্ষতিকর ছিলে। আমি সেটা তখন বুঝিনি, এখন বুঝি। তোমার সাথে থাকলে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম চিরকালের জন্য। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন, আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। কুরআনে তিনি বলেছেন—হয়তো তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করো যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আমি এখন এই আয়াতটা বুকে ধারণ করে চলি। তোমাকে না পাওয়াটাই হয়তো আমার জন্য সবচেয়ে বড় কল্যাণ ছিল। আমি এখন আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখি। তিনি আমার জন্য যা রেখেছেন, সেটা তোমার চেয়ে অনেক অনেক ভালো হবে। ০৬. হাসিটা এখন অভিনয় হয়ে হাসিটা এখন অভিনয় হয়ে গেছে, আর কান্নাটা হয়ে গেছে অভ্যাস। মানুষের সামনে আমি হাসি, কারণ কাঁদলে তারা প্রশ্ন করবে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো শক্তি আমার নেই। তাই আমি মুখোশ পরে ঘুরি—হাসিখুশি, প্রাণবন্ত, চঞ্চল। কেউ জানে না এই মুখোশের পেছনে কতটা ক্লান্ত একটা মানুষ লুকিয়ে আছে। রাতে ঘরে ফিরে মুখোশটা খুলে রাখি টেবিলে। তখন আয়নায় নিজেকে দেখি—চোখের নিচে কালি, ঠোঁটে শুকনো রক্ত। এই আমিটাই আসল আমি, বাইরের আমিটা নকল। কিন্তু আসল আমিকে কেউ দেখতে চায় না, সবাই নকলটাকেই পছন্দ করে। তাই আমি নকল হয়েই বাঁচি, নকল হাসি দিয়েই দিন কাটাই। একদিন হয়তো এই নকল হাসিটাই সত্যি হয়ে যাবে। সেদিনের জন্য আমি অপেক্ষা করছি, ধৈর্য ধরে। ০৭. তোমার শেষ বার্তাটা এখনো তোমার শেষ বার্তাটা এখনো আমার ফোনে সেভ করা আছে। মুছে ফেলতে পারি না, কারণ মুছে ফেললে তোমার শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যাবে। তুমি লিখেছিলে—ভালো থেকো। মাত্র দুটো অক্ষর। কিন্তু এই দুটো কথার পেছনে কতটা উদাসীনতা লুকিয়ে ছিল, সেটা আমি বুঝেছি। তুমি আমাকে ভালো থাকতে বলেছ, অথচ তুমিই আমার ভালো থাকাটা কেড়ে নিয়ে গেছ। কী হাস্যকর, তাই না? আমি সেই বার্তাটা মাঝে মাঝে পড়ি, আর ভাবি—তুমি কি সত্যিই চেয়েছিলে আমি ভালো থাকি? নাকি এটা শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা ছিল, বিদায়ের শিষ্টাচার? আমি কোনোদিন জানব না উত্তরটা, কারণ তোমাকে আর জিজ্ঞেস করার সুযোগ নেই। তুমি তোমার জীবনে ব্যস্ত, আমি আমার কষ্টে ব্যস্ত। দুজনের পথ আলাদা, দুজনের গন্তব্য আলাদা। শুধু সেই দুটো কথা আমাদের মাঝে সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—ভালো থেকো। ০৮. বিশ্বাসঘাতকতার চেয়ে বড় কষ্ট বিশ্বাসঘাতকতার চেয়ে বড় কষ্ট এই পৃথিবীতে আর নেই। যাকে তুমি অন্ধভাবে বিশ্বাস করেছ, সে যখন তোমার পিঠে ছুরি মারে— সেই যন্ত্রণা বোঝানোর মতো কোনো ভাষা নেই। আমি সেই যন্ত্রণা সহ্য করেছি, নীরবে, একা। কাউকে বলিনি, কারণ বললে তারা বলত—তুমিই বোকা, কেন বিশ্বাস করেছিলে? হ্যাঁ, আমি বোকা ছিলাম। বোকা ছিলাম বলেই ভালোবাসতে পেরেছিলাম। বুদ্ধিমান মানুষেরা ভালোবাসে না, তারা হিসেব করে। আমি হিসেব করতে জানতাম না, তাই সবটুকু দিয়ে দিয়েছিলাম। বিনিময়ে পেয়েছি প্রতারণা, মিথ্যে আর অবহেলা। এখন আমি হিসেব করতে শিখেছি, কিন্তু ভালোবাসতে ভুলে গেছি। কোনটা ভালো হলো আর কোনটা খারাপ, সেটা আমি এখনো বুঝতে পারি না। শুধু জানি—আগের সেই সরল মেয়েটা আর নেই, সে মরে গেছে তোমার বিশ্বাসঘাতকতায়। ০৯. একটু সম্মান চেয়েছিলাম শুধু একটু সম্মান চেয়েছিলাম তোমার কাছে, ভালোবাসা তো পরের কথা। তুমি আমাকে এমনভাবে কথা বলতে, যেন আমি তোমার কেউ নই। আমার মতামতের কোনো দাম ছিল না তোমার কাছে। আমার অনুভূতিগুলোকে তুমি পায়ে মাড়িয়ে চলে যেতে। আমি সব সহ্য করেছি, কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু ভালোবাসা মানে তো নিজেকে অপমানিত হতে দেওয়া নয়। সেদিন আমি বুঝলাম—যে সম্পর্কে সম্মান নেই, সেখানে আমার থাকাটা অপমান। আমি সেই অপমান থেকে বেরিয়ে এসেছি, আর কোনোদিন ফিরব না। এখন আমি এমন কাউকে চাই যে আমাকে সম্মান দেবে, আমার কথা শুনবে। আর যদি এমন কেউ না-ও পাই, তাহলে একা থাকব—কিন্তু অসম্মানিত হব না। আমার আত্মসম্মান আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এটা আমি কারও জন্য বিসর্জন দেব না, কোনোদিন না। ১০. রাতের তাহাজ্জুদে তোমার কথা রাতের তাহাজ্জুদে যখন সেজদায় যাই, তখন তোমার কথা মনে পড়ে। আমি আল্লাহর কাছে কাঁদি—ইয়া আল্লাহ, এই কষ্টটা সহ্য করার শক্তি দাও। তিনি শোনেন, আমি জানি তিনি শোনেন। কারণ প্রতিটি সেজদার পর আমার বুকটা একটু হালকা হয়ে যায়। মানুষের কাছে কাঁদলে তারা দুর্বল ভাবে, কিন্তু আল্লাহর কাছে কাঁদলে তিনি কাছে টেনে নেন। আমি তাই মানুষের কাছে কাঁদা বন্ধ করে দিয়েছি। এখন শুধু আল্লাহর কাছেই কাঁদি, শুধু তাঁর কাছেই মন খুলি। তিনি আমার সব কথা জানেন, আমার সব কষ্ট বোঝেন। মানুষ বোঝে না, বোঝার চেষ্টাও করে না। কিন্তু আল্লাহ বোঝেন, কারণ তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন আমার সহ্যের সীমা কতটুকু, তাই তিনি আমাকে সেই পরিমাণই পরীক্ষা দেন। আমি তাঁর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাচ্ছি, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। ১১. পুরনো ডায়েরি খুললে চোখ ভেজে পুরনো ডায়েরি খুললে চোখ ভেজে যায়, কারণ সেখানে তোমার নাম লেখা আছে। একদিন লিখেছিলাম—আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ আমি। আজ সেই একই ডায়েরিতে লিখছি—আমি পৃথিবীর সবচেয়ে একা মানুষ। কত দ্রুত বদলে যায় সবকিছু, তাই না? সেই পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে, কিন্তু তোমার স্মৃতি এখনো টাটকা। আমি চাই সেই স্মৃতিগুলোও হলুদ হয়ে যাক, বিবর্ণ হয়ে যাক। কিন্তু স্মৃতি তো কাগজ নয়, সময়ের সাথে সে আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। আমি ডায়েরিটা বন্ধ করে আলমারিতে রেখে দিই। কিন্তু জানি, কিছুদিন পর আবার খুলব, আবার কাঁদব। এই চক্রটা আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আমি এই চক্র থেকে বেরোতে চাই, কিন্তু পারি না। হয়তো একদিন পারব, যেদিন তোমার স্মৃতি সত্যিই বিবর্ণ হয়ে যাবে। ১২. তাকদীরের লেখা মুছে ফেলা তাকদীরে যা লেখা আছে, তা মুছে ফেলার ক্ষমতা কারও নেই। আমি চেষ্টা করেছি তোমাকে ধরে রাখতে, কিন্তু তাকদীর তোমাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। আমি রাগ করেছি আল্লাহর ওপর, কিন্তু পরে বুঝেছি—রাগ করাটা ভুল ছিল। তিনি যা করেন, হিকমত দিয়ে করেন। আমার ছোট্ট মাথায় তাঁর পরিকল্পনা ধরবে না। আমি শুধু এটুকু জানি—তিনি আমাকে কষ্ট দিতে চান না। যদি তোমাকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই এতে কোনো কল্যাণ আছে। হয়তো সেই কল্যাণটা আমি এখনো দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু একদিন দেখব। সেদিন আমি আল্লাহকে ধন্যবাদ দেব, তোমাকে আমার জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। আমি এখন ধৈর্য ধরে আছি, কারণ ধৈর্যশীলদের আল্লাহ ভালোবাসেন। আমি তাঁর ভালোবাসা পেতে চাই, তোমার ভালোবাসার চেয়ে সেটা অনেক বেশি মূল্যবান। তাই আমি সবর করছি, আর তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করছি। ১৩. চাওয়া-পাওয়ার হিসেব মেলে না চাওয়া আর পাওয়ার হিসেব কোনোদিন মেলে না এই জীবনে। আমি তোমাকে চেয়েছিলাম সারাজীবনের জন্য, পেয়েছিলাম কয়েকটা মাসের জন্য। সেই কয়েকটা মাসে তুমি আমাকে স্বর্গ দেখিয়েছিলে। তারপর হঠাৎ করে সব কেড়ে নিয়ে নরকে ফেলে দিয়েছিলে। আমি সেই নরক থেকে এখনো বের হতে পারিনি। প্রতিদিন পুড়ছি তোমার স্মৃতির আগুনে, প্রতিরাত জ্বলছি তোমার অনুপস্থিতিতে। কিন্তু আমি জানি এই আগুন একদিন নিভবে। কারণ কোনো আগুনই চিরকাল জ্বলে না, একদিন না একদিন ছাই হয়ে যায়। আমার কষ্টটাও একদিন ছাই হয়ে যাবে, আমি সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করছি। ততদিন আমি পুড়ব, কিন্তু চিৎকার করব না। কারণ আমি শিখে গেছি—চিৎকার করলে কেউ আসে না, শুধু তামাশা দেখে। তাই আমি চুপচাপ সহ্য করি, একা একা। ১৪. অভিমান করার মানুষ নেই অভিমান করার মতো একটা মানুষও নেই আমার জীবনে। অভিমান তো তাকেই করা যায়, যে তোমাকে বোঝে, যে তোমার কাছে আসবে। আমার অভিমান বোঝার মতো কেউ নেই, তাই আমি অভিমান করাই ছেড়ে দিয়েছি। আগে তোমার ওপর অভিমান করতাম, তুমি বুঝতে, কাছে আসতে। সেই দিনগুলো এখন শুধু স্মৃতি। এখন আমি রাগ করলে কেউ জিজ্ঞেস করে না কী হয়েছে। আমি কাঁদলে কেউ এসে চোখ মুছিয়ে দেয় না। আমি চুপ করে থাকলে কেউ জোর করে কথা বলায় না। এই একাকীত্বটা আমাকে শক্ত করেছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি খুব ভঙ্গুর। একটু ভালোবাসা পেলেই হয়তো ভেঙে পড়ব, কারণ আমি অনেকদিন ভালোবাসা পাইনি। কিন্তু আমি সেই ভালোবাসার জন্য আর কারও দিকে তাকাব না। আল্লাহর কাছে চাইব, তিনিই দেবেন—যখন সময় হবে, যেভাবে তিনি চান। ১৫. মানুষ চেনা সবচেয়ে কঠিন মানুষ চেনা এই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। বাইরে থেকে সবাই সুন্দর, ভেতরে কে কেমন—সেটা কেউ জানে না। আমি তোমাকে চিনতে পারিনি, এটা আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তুমি হাসতে হাসতে আমাকে ধ্বংস করেছ, আর আমি বুঝতেই পারিনি। তোমার মিষ্টি কথার আড়ালে কত বিষ লুকিয়ে ছিল, সেটা আমি অনেক পরে বুঝেছি। তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, আমি ইতোমধ্যে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছি। এখন আমি সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখি, এটা হয়তো ভালো নয়। কিন্তু আমি আর ঠকতে রাজি নই। একবার ঠকেছি, সেই শিক্ষাই যথেষ্ট আমার জন্য। এখন থেকে আমি কাউকে কাছে আসতে দেওয়ার আগে অনেকবার ভাবব। তাড়াহুড়ো করে কাউকে বিশ্বাস করব না, তাড়াহুড়ো করে কাউকে ভালোবাসব না। সময় নেব, যাচাই করব, তারপর সিদ্ধান্ত নেব। ১৬. তোমার জন্য দোয়া করি তোমার জন্য প্রতিদিন দোয়া করি, যদিও তুমি আমার কেউ নও। নামাজের পর হাত তুললে তোমার নামটা আপনাআপনি চলে আসে। আমি চাই তুমি ভালো থাকো, সুখে থাকো, হাসিখুশি থাকো। তোমার জীবনে যেন কোনো কষ্ট না আসে, কোনো অভাব না থাকে। তুমি হয়তো জানো না, তোমার জন্য কেউ প্রতিদিন দোয়া করে। জানলে হয়তো অবাক হতে, হয়তো হাসতে। কিন্তু আমার কাছে এই দোয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটাই আমার ভালোবাসার শেষ চিহ্ন, এটুকু আমি রেখে দিতে চাই। তোমাকে আমি পাইনি, কিন্তু তোমার জন্য দোয়া করার অধিকারটুকু কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। এটা আমার আর আল্লাহর মধ্যকার ব্যাপার, এখানে তোমার অনুমতির দরকার নেই। আমি দোয়া করতে থাকব, যতদিন বেঁচে আছি। কারণ ভালোবাসা মানে তো শুধু পাওয়া নয়, ভালোবাসা মানে অন্যের মঙ্গল কামনা করা। ১৭. বৃষ্টির দিনে তোমাকে মনে বৃষ্টির দিনে তোমাকে বেশি মনে পড়ে, কারণ তুমি বৃষ্টি ভালোবাসতে। আমি জানালার ধারে বসে বৃষ্টি দেখি, আর তোমার কথা ভাবি। তুমি বলতে—বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করে, চলো ভিজি। আমি বলতাম—সর্দি হবে, ভিজো না। তুমি হাসতে, আমার হাত ধরে বৃষ্টিতে টেনে নিয়ে যেতে। সেই দিনগুলো এখন শুধু স্মৃতি, আর বৃষ্টি এখন শুধু কান্নার অজুহাত। বৃষ্টি হলে আমার চোখও ভেজে, কেউ বুঝতে পারে না—বৃষ্টির জল না চোখের জল। এই গোপন কান্নাটাই আমার বৃষ্টির দিনের সঙ্গী। আমি চাই বৃষ্টি বন্ধ হোক, যাতে আমার কান্নাও বন্ধ হয়। কিন্তু বৃষ্টি তো আমার কথা শোনে না, সে তার নিয়মে আসে, নিয়মে যায়। ঠিক তোমার মতো—তুমিও তোমার নিয়মে এসেছিলে, তোমার নিয়মে চলে গেছ। আমার নিয়মের কোনো দাম ছিল না তোমার কাছে, বৃষ্টির কাছেও নেই। ১৮. কেউ কাউকে পুরোটা বোঝে না কেউ কাউকে পুরোটা বোঝে না, এটাই সম্পর্কের সবচেয়ে তিক্ত সত্য। তুমি ভেবেছিলে আমাকে বোঝো, আমি ভেবেছিলাম তোমাকে বুঝি। কিন্তু আমরা দুজনেই ভুল ছিলাম। তুমি আমার হাসির পেছনের কান্না দেখোনি, আমি তোমার নীরবতার পেছনের রাগ বুঝিনি। এই না-বোঝাপড়াই আমাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। আমি এখন ভাবি—যদি একটু বেশি চেষ্টা করতাম, তাহলে কি ফলাফল ভিন্ন হতো? হয়তো হতো, হয়তো হতো না—কে জানে? কিন্তু এখন আর ভেবে লাভ নেই, যা হয়ে গেছে তা ফেরানো যায় না। আমি শুধু এই শিক্ষাটা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি—মানুষকে বোঝার চেষ্টা করো, কিন্তু পুরোটা বোঝা সম্ভব নয়। প্রতিটি মানুষের ভেতরে একটা অজানা জগৎ আছে, যেখানে কারও প্রবেশাধিকার নেই। তোমার সেই জগতে আমি ঢুকতে পারিনি, তুমিও আমার জগতে ঢোকোনি। আমরা দুজনেই দুটো আলাদা দ্বীপ ছিলাম, যাদের মাঝে সেতু তৈরি হয়নি কোনোদিন। ১৯. নিজেকে সময় দেওয়াটা জরুরি নিজেকে সময় দেওয়াটা জরুরি, এটা আমি অনেক দেরিতে বুঝেছি। তোমার পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজেকে একদম ভুলে গিয়েছিলাম। আমার শখ ছিল, স্বপ্ন ছিল, ইচ্ছে ছিল—সব তোমার জন্য বিসর্জন দিয়েছিলাম। তুমি চলে যাওয়ার পর বুঝলাম—আমার হাতে কিছুই নেই। না তুমি আছ, না আমার স্বপ্নগুলো আছে। সেদিন থেকে আমি নিজেকে সময় দিতে শুরু করেছি। আবার বই পড়ি, আবার গান শুনি, আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি আবার সেই মেয়েটাকে খুঁজে পাচ্ছি, যে তোমার আসার আগে ছিল। সে হাসতে জানত, স্বপ্ন দেখতে জানত, নিজেকে ভালোবাসতে জানত। তুমি এসে সেই মেয়েটাকে মেরে ফেলেছিলে, এখন আমি তাকে আবার বাঁচাচ্ছি। এই বাঁচানোর প্রক্রিয়াটা ধীর, কিন্তু আমি ছাড়ব না। একদিন সেই মেয়েটা পুরোপুরি ফিরে আসবে, আর সেদিন আমি সত্যিকারের মুক্তি পাব। ২০. সম্পর্কে সততাটাই সবচেয়ে বড় সম্পর্কে সততাটাই সবচেয়ে বড় সম্পদ, বাকি সব গৌণ। তুমি যদি সৎ থাকতে, তাহলে আমি সব মেনে নিতাম। তুমি যদি বলতে—আমি তোমাকে ভালোবাসি না, আমি চলে যেতাম। কষ্ট পেতাম, কিন্তু মেনে নিতাম। কিন্তু তুমি মিথ্যে বলেছ, ভালোবাসার অভিনয় করেছ। আর সেই অভিনয়ে আমি বোকার মতো বিশ্বাস করেছি। মিথ্যে ভালোবাসার চেয়ে সৎ প্রত্যাখ্যান অনেক ভালো। কারণ সৎ প্রত্যাখ্যান তোমাকে কষ্ট দেয়, কিন্তু মিথ্যে ভালোবাসা তোমাকে ধ্বংস করে। আমি ধ্বংস হয়েছি তোমার মিথ্যেয়, এখন নিজেকে আবার গড়ে তুলছি। এবার আমি এমন কাউকে চাইব যে সৎ হবে, যে আমাকে সত্যি কথা বলবে। মিষ্টি মিথ্যের চেয়ে তিক্ত সত্য আমার কাছে বেশি প্রিয়। কারণ সত্য কষ্ট দেয়, কিন্তু বাঁচায়। আর মিথ্যে সুখ দেয়, কিন্তু মারে। ২১. ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করে না ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করে না আজকাল, কারণ ঘরে কেউ নেই। আগে তুমি থাকতে, ঘরটা প্রাণবন্ত ছিল, কথায় ভরা ছিল। এখন ঘরটা শুধু ইট-কাঠের কাঠামো, তার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই। আমি দরজা খুলে ঢুকি, জুতো খুলি, ব্যাগ রাখি—সব যান্ত্রিকভাবে। কেউ জিজ্ঞেস করে না—খেয়েছ? ক্লান্ত? কেমন গেল দিনটা? এই ছোট ছোট প্রশ্নগুলোই তো ঘরকে ঘর করে তোলে। প্রশ্ন না থাকলে ঘর আর ঘর থাকে না, সে হয়ে যায় আশ্রয়। আমি এখন আশ্রয়ে থাকি, ঘরে নয়। তফাৎটা বুঝতে পারি প্রতিটি সন্ধ্যায়, যখন একা বসে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকি। দেয়ালগুলো আমার কথা শোনে, কিন্তু উত্তর দেয় না। ঠিক তোমার মতো—তুমিও আমার কথা শুনতে, কিন্তু কোনোদিন সত্যিকারের উত্তর দাওনি। হয়তো এই ঘরটাই আমার সবচেয়ে সৎ সঙ্গী, কারণ সে অন্তত মিথ্যে বলে না। ২২. কিছু সম্পর্ক মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে কিছু সম্পর্কের মেয়াদ থাকে, সেটা আমরা মানতে চাই না। আমাদের সম্পর্কটাও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে, কিন্তু আমি সেটা স্বীকার করতে রাজি ছিলাম না। আমি আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু যা শেষ হয়ে গেছে তাকে জোর করে বাঁচানো যায় না। ঠিক যেমন শুকনো ফুলকে জল দিলেও সে আর তাজা হয় না। আমাদের সম্পর্কটাও শুকিয়ে গেছে, আর কোনো জল তাকে বাঁচাতে পারবে না। আমি এটা মেনে নিয়েছি, যদিও মেনে নেওয়াটা সহজ ছিল না। অনেক রাত কেঁদেছি, অনেক দিন খাইনি, অনেকদিন কারও সাথে কথা বলিনি। কিন্তু একসময় বুঝেছি—কান্না দিয়ে কিছু ফেরানো যায় না। যা যাওয়ার তা যাবেই, তুমি যতই চেষ্টা করো। এখন আমি সেই শুকনো ফুলটাকে বইয়ের পাতায় রেখে দিয়েছি—স্মৃতি হিসেবে। সে আর ফুটবে না, কিন্তু তার সৌন্দর্যের কথা আমি মনে রাখব। ঠিক তোমার মতো—তুমি আর ফিরবে না, কিন্তু তোমার সাথে কাটানো দিনগুলো আমি ভুলব না। ২৩. নিজের কাছে ফিরে আসাটাই নিজের কাছে ফিরে আসাটাই সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা। তোমাকে হারিয়ে আমি নিজেকেও হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি কে, আমি কী চাই, আমার পরিচয় কী—সব ভুলে গিয়েছিলাম। তোমার পরিচয়ে নিজেকে পরিচয় দিতাম, তোমার ইচ্ছেকে নিজের ইচ্ছে মনে করতাম। তুমি চলে যাওয়ার পর বুঝলাম—আমার নিজস্ব কোনো পরিচয়ই নেই। সেদিন থেকে শুরু হলো নিজেকে খোঁজার যাত্রা। আমি আবার সেই পুরনো শখগুলো ফিরিয়ে আনছি—লেখালেখি, ছবি আঁকা, বই পড়া। আমি আবার নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিচ্ছি, কারও মুখাপেক্ষী হচ্ছি না। এই স্বাধীনতাটা আমার কাছে নতুন, কিন্তু অসম্ভব সুন্দর। আমি বুঝতে পারছি—আমি আসলে অনেক শক্তিশালী, শুধু তোমার সাথে থেকে সেটা ভুলে গিয়েছিলাম। তুমি আমাকে দুর্বল করে দিয়েছিলে, এখন আমি নিজেকে আবার শক্ত করছি। এই যাত্রাটা কঠিন, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে আমি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছি। ২৪. রাতের আকাশে তারা গুনি রাতের আকাশে তারা গুনি আর তোমার কথা ভাবি। তুমি বলতে—প্রতিটি তারা একটা করে মৃত মানুষের আত্মা। আমি হাসতাম, বলতাম—বোকা, এসব কী বলো! এখন তুমি নেই, আমি রাতে তারা দেখলে ভাবি—তুমিও কি ওখানে কোথাও আছ? না, তুমি মরোনি, তুমি শুধু আমার জীবন থেকে চলে গেছ। কিন্তু চলে যাওয়াটাও তো এক ধরনের মৃত্যু, তাই না? সম্পর্কের মৃত্যু, বিশ্বাসের মৃত্যু, স্বপ্নের মৃত্যু। আমি এত মৃত্যু দেখেছি তোমার যাওয়ার পর, যে এখন আর মৃত্যুতে ভয় পাই না। তারাগুলো মিটমিট করে, আমি তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। তারা আমাকে কিছু বলতে চায়, কিন্তু আমি তাদের ভাষা বুঝি না। হয়তো তারা বলছে—ছেড়ে দাও, এগিয়ে যাও। হয়তো তারা বলছে—সব ঠিক হয়ে যাবে, শুধু ধৈর্য ধরো। ২৫. ভালোবাসা দিতে জানি আমি ভালোবাসা দিতে জানি আমি, কিন্তু চাইতে জানি না। এটাই আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা—আমি সবসময় দিয়ে যাই, বিনিময়ে কিছু চাই না। মানুষ আমার এই স্বভাবটাকে দুর্বলতা মনে করে, সুযোগ নেয়। তুমিও নিয়েছিলে—আমার ভালোবাসা, আমার সময়, আমার যত্ন। বিনিময়ে দিয়েছ উদাসীনতা, অবহেলা আর তুচ্ছতাচ্ছিল্য। আমি তবুও দিয়ে গেছি, কারণ আমি ভালোবাসলে পুরোটাই দিই। অর্ধেক ভালোবাসা আমি জানি না, হয় পুরোটা নয়তো কিছুই না। তুমি আমার পুরোটা নিয়ে চলে গেছ, আমাকে শূন্য করে দিয়ে। এখন আমি সেই শূন্যতা থেকে নিজেকে ভরাচ্ছি—নিজের ভালোবাসা দিয়ে। আমি নিজেকে ভালোবাসতে শিখছি, নিজের যত্ন নিতে শিখছি। এটা সহজ নয়, কারণ অন্যকে ভালোবাসতে অভ্যস্ত মানুষের পক্ষে নিজেকে ভালোবাসা কঠিন। কিন্তু আমি চেষ্টা করছি, আর প্রতিদিন একটু একটু করে পারছি। ২৬. সকালের আজান শুনলে মনে সকালের আজান শুনলে মনে হয় আল্লাহ আমাকে ডাকছেন। তিনি বলছেন—এসো, তোমার কষ্টগুলো আমাকে দাও, আমি হালকা করে দেব। আমি উঠি, অজু করি, জায়নামাজে দাঁড়াই। সেজদায় গিয়ে সব কষ্ট ঢেলে দিই, আর উঠে দেখি—বুকটা হালকা। এই অনুভূতিটা পৃথিবীর কোনো কিছুতে পাওয়া যায় না। মানুষের কাছে কষ্ট বললে তারা পরামর্শ দেয়, কিন্তু কষ্ট কমায় না। আল্লাহর কাছে কষ্ট বললে তিনি পরামর্শ দেন না, সরাসরি কষ্ট কমিয়ে দেন। এই তফাৎটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। তোমাকে হারানোর পর আমি মানুষের কাছে গিয়েছিলাম, কেউ সাহায্য করেনি। তারপর আল্লাহর কাছে গিয়েছি, তিনি সাহায্য করেছেন। তিনি আমাকে ধৈর্য দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন, নতুন করে বাঁচার কারণ দিয়েছেন। আমি তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ, তিনি না থাকলে আমি আজ এখানে থাকতাম না। ২৭. কিছু কথা বলা হয়নি কিছু কথা বলা হয়নি তোমাকে, সেগুলো বুকে জমে আছে। আমি বলতে চেয়েছিলাম—তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। কিন্তু বলিনি, কারণ ভয় ছিল—তুমি হয়তো গুরুত্ব দেবে না। আমি বলতে চেয়েছিলাম—তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। কিন্তু বলিনি, কারণ দুর্বল দেখাতে চাইনি। এখন তুমি চলে গেছ, আর সেই কথাগুলো বলার কেউ নেই। আমি দেয়ালকে বলি, আয়নাকে বলি, রাতের অন্ধকারকে বলি। কিন্তু কেউ উত্তর দেয় না, কারণ তারা তো তুমি নও। এই না-বলা কথাগুলো আমার বুকে পাথর হয়ে চেপে বসে আছে। আমি সেই পাথর বহন করে চলেছি প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্ত। একদিন হয়তো এই পাথর গুঁড়ো হয়ে যাবে, কিন্তু আজ নয়। আজ আমি শুধু বহন করি, কারণ এটুকুই আমার সাধ্য। ২৮. তোমার হাসিটা আমার দুর্বলতা তোমার হাসিটা আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল। তুমি হাসলে আমি সব ভুলে যেতাম—রাগ, অভিমান, কষ্ট। তুমি সেটা জানতে, আর সেই জানাটাকে তুমি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে। যখনই আমি রাগ করতাম, তুমি একটু হাসতে—ব্যস, আমার সব রাগ উবে যেত। কিন্তু তোমার সেই হাসির পেছনে কোনো অনুশোচনা ছিল না। তুমি শুধু আমাকে শান্ত করতে হাসতে, ভুল শোধরাতে নয়। আমি বোকার মতো প্রতিবার ক্ষমা করে দিতাম, আর তুমি প্রতিবার একই ভুল করতে। এই চক্রটা চলেছে অনেকদিন, যতদিন না আমি বুঝেছি—তোমার হাসি আমার জন্য বিষ। সেদিন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি—আর নয়। তোমার হাসি আর আমাকে দুর্বল করতে পারবে না। আমি এখন নিজের শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছি, তোমার হাসির মুখাপেক্ষী নই। এই শক্তিটা আমি অনেক কষ্টে অর্জন করেছি, কেউ এটা কেড়ে নিতে পারবে না। ২৯. একটা চিঠি লিখেছিলাম তোমাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম তোমাকে, কিন্তু পাঠাইনি। সেই চিঠিতে আমার সব কথা ছিল—ভালোবাসা, কষ্ট, অভিযোগ, ক্ষমা। আমি লিখেছিলাম—তুমি আমাকে যত কষ্ট দিয়েছ, আমি সব ক্ষমা করে দিলাম। আমি লিখেছিলাম—তোমার জন্য আমার কোনো রাগ নেই, শুধু একটু দুঃখ আছে। সেই চিঠিটা এখনো আমার ড্রয়ারে পড়ে আছে, ভাঁজ করা। মাঝে মাঝে বের করে পড়ি, আর নিজের লেখা পড়ে নিজেই কাঁদি। কী অদ্ভুত—নিজের কষ্টের কথা নিজে পড়ে নিজেই কাঁদছি! এই চিঠিটা কোনোদিন তোমার কাছে পৌঁছাবে না, আমি জানি। কিন্তু এটা লেখাটাই ছিল আমার জন্য থেরাপি। লিখতে লিখতে বুকের ভেতরের জমাট কষ্টটা একটু একটু করে বেরিয়ে এসেছে। আমি এখন ভালো আছি, পুরোপুরি নয়, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক ভালো। এই চিঠিটাই আমাকে বাঁচিয়েছে, তোমাকে না পাঠালেও। ৩০. সময় সবচেয়ে বড় শিক্ষক সময় সবচেয়ে বড় শিক্ষক, কিন্তু সে পরীক্ষা আগে নেয়, পাঠ পরে দেয়। আমি পরীক্ষায় ফেল করেছি অনেকবার, কিন্তু পাঠটা শেষমেশ শিখেছি। তুমি ছিলে আমার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা, আর তোমাকে হারানোটা ছিল সবচেয়ে বড় পাঠ। এই পাঠ আমাকে শিখিয়েছে—কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করো না। এই পাঠ আমাকে শিখিয়েছে—নিজেকে সবার আগে রাখো। এই পাঠ আমাকে শিখিয়েছে—ভালোবাসা মানে নিজেকে হারানো নয়। আমি এই পাঠগুলো মনে রাখব সারাজীবন। তোমাকে ভুলে যাব হয়তো, কিন্তু তোমার দেওয়া শিক্ষা ভুলব না। তুমি আমার শিক্ষক ছিলে, যদিও তুমি সেটা জানো না। তোমার অজান্তেই তুমি আমাকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দিয়ে গেছ। আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ, এই কৃতজ্ঞতাটুকু সত্যি। কারণ তুমি না থাকলে আমি কোনোদিন এত শক্ত হতে পারতাম না। ৩১. বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার পার্থক্য বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার মাঝে একটা সরু রেখা আছে। সেই রেখা পার হলে আর ফেরা যায় না, আমি সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। তুমি আমার বন্ধু ছিলে, আমি বোকার মতো ভালোবেসে ফেললাম। সেদিন থেকে সবকিছু বদলে গেল—তোমার চোখে আমি আর আগের মানুষ রইলাম না। তুমি দূরে সরে গেলে, আমি কাছে আসতে চাইলাম। এই টানাপোড়েনে বন্ধুত্বটাও গেল, ভালোবাসাটাও পেলাম না। দুটোই হারালাম একসাথে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় ক্ষতি। এখন ভাবি—যদি সেই রেখাটা পার না হতাম, তাহলে অন্তত বন্ধুটা থাকত। কিন্তু হৃদয় তো যুক্তি মানে না, সে যা চায় তা-ই করে। আমার হৃদয় তোমাকে চেয়েছিল, আমি কিছু করতে পারিনি। এখন আমি সেই হৃদয়কে শাসন করতে শিখেছি, আর কোনো বন্ধুকে ভালোবাসব না। বন্ধুত্বকে বন্ধুত্বের জায়গায় রাখব, সীমানা মানব। ৩২. তোমার গন্ধ লেগে আছে তোমার গন্ধ লেগে আছে আমার ওড়নায়, আমার বালিশে, আমার ঘরের প্রতিটি কোণে। আমি ধুয়ে ফেলতে পারি কাপড়, কিন্তু স্মৃতি তো ধোয়া যায় না। তোমার পারফিউমের গন্ধটা যখন কোথাও পাই, মনে হয় তুমি কাছেই আছ। আমি চারপাশে তাকাই, কিন্তু তুমি নেই—শুধু তোমার গন্ধটুকু আছে। কী নিষ্ঠুর এই ইন্দ্রিয়গুলো—তোমাকে ভুলতে দেয় না! চোখ বন্ধ করলে তোমার মুখ দেখি, কান পাতলে তোমার কণ্ঠ শুনি। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে, তোমার এই অনুপস্থিত উপস্থিতিতে। তুমি নেই, কিন্তু তোমার চিহ্ন সর্বত্র। আমি সেই চিহ্নগুলো মুছে ফেলতে চাই, কিন্তু সাহস পাই না। মুছে ফেললে তোমার শেষ স্মৃতিটুকুও চলে যাবে। আমি কি সত্যিই সেটা চাই? নাকি আমি তোমাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাই? এই প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেও জানি না। ৩৩. মানুষ বদলায় সময়ের সাথে মানুষ বদলায়, এটা স্বাভাবিক—কিন্তু এত দ্রুত বদলায়, সেটা আমি জানতাম না। তুমি যে মানুষটা ছিলে আমার সাথে, আর যে মানুষটা চলে গেছে—দুজন সম্পূর্ণ আলাদা। আমি প্রথম মানুষটাকে ভালোবেসেছিলাম, দ্বিতীয়জনকে চিনি না। তুমি কখন বদলে গেলে, আমি টেরই পাইনি। হয়তো আমি তোমাকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে তোমার বদলে যাওয়াটা চোখে পড়েনি। হয়তো আমি দেখেও না দেখার ভান করেছি, কারণ সত্যটা মেনে নেওয়ার সাহস ছিল না। কিন্তু সত্য তো সত্যই, তাকে অস্বীকার করলেও সে বদলায় না। তুমি বদলে গেছ, আমিও বদলে গেছি—শুধু আমাদের বদলানোর দিক আলাদা। তুমি আমার থেকে দূরে সরে গেছ, আমি তোমার দিকে এগিয়ে গেছি। এই বিপরীতমুখী যাত্রায় আমরা আর কোনোদিন মিলব না। আমি সেটা মেনে নিয়েছি, কষ্ট পেয়ে, কিন্তু মেনে নিয়েছি। কারণ মেনে না নিলে আমি নিজেকে ধ্বংস করে ফেলতাম। ৩৪. আমার লেখায় তুমি বেঁচে আমার লেখায় তুমি বেঁচে আছ, যদিও আমার জীবনে তুমি মৃত। প্রতিটি লেখায় তোমার ছোঁয়া আছে, তোমার স্মৃতি আছে, তোমার অনুপস্থিতি আছে। তুমি না থাকলে হয়তো আমি লিখতেই পারতাম না। কষ্টটাই আমার কলমের জ্বালানি, আর তুমি সেই কষ্টের উৎস। কী পরিহাস—যে মানুষটা আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে, সে-ই আমার লেখার অনুপ্রেরণা! আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারি না, কারণ তুমি আমাকে লেখক বানিয়েছ। আমি তোমাকে ধন্যবাদও দিতে পারি না, কারণ তুমি আমাকে ভেঙে দিয়েছ। এই দ্বন্দ্বটা আমার ভেতরে প্রতিনিয়ত চলছে। আমি লিখি আর ভাবি—তুমি কি কোনোদিন আমার লেখা পড়বে? পড়লে কি বুঝবে এই লেখাগুলো তোমার জন্য? হয়তো বুঝবে, হয়তো বুঝবে না—কিন্তু আমি লিখে যাব। কারণ লেখাই আমার থেরাপি, লেখাই আমার মুক্তি। ৩৫. একটু করে মরে যাচ্ছি একটু করে মরে যাচ্ছি প্রতিদিন, কেউ দেখছে না। বাইরে থেকে আমি স্বাভাবিক—অফিসে যাই, কাজ করি, মানুষের সাথে কথা বলি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি ক্ষয়ে যাচ্ছি, একটু একটু করে। তোমার চলে যাওয়াটা আমাকে এমনভাবে আঘাত করেছে, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। এটা শরীরের ক্ষত নয়, এটা মনের ক্ষত—আর মনের ক্ষত সারতে অনেক সময় লাগে। আমি সময় দিচ্ছি নিজেকে, কিন্তু কতদিন? কত মাস, কত বছর লাগবে এই ক্ষত সারতে? কেউ বলতে পারে না, কারণ মনের ক্ষতের কোনো ডাক্তার নেই। আমি নিজেই নিজের ডাক্তার, নিজেই নিজের ওষুধ। প্রতিদিন নিজেকে বলি—তুমি পারবে, তুমি সেরে উঠবে। কখনো বিশ্বাস হয়, কখনো হয় না। কিন্তু বলা বন্ধ করি না, কারণ এই কথাটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখছে। ৩৬. জানালা দিয়ে সন্ধ্যা দেখি জানালা দিয়ে সন্ধ্যা দেখি আর ভাবি—আরেকটা দিন শেষ হলো। তোমাকে ছাড়া আরেকটা দিন কাটালাম, এটাই আমার প্রতিদিনের বিজয়। ছোট বিজয়, কিন্তু আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বড়। কারণ তোমাকে ছাড়া একটা দিন কাটানো আমার জন্য যুদ্ধের সমান। সকালে উঠে তোমাকে মনে পড়ে, দুপুরে খেতে বসলে তোমার কথা ভাবি। বিকেলে চা খেতে গিয়ে তোমার খালি চেয়ারটা দেখি। রাতে ঘুমাতে গিয়ে তোমার পাশের খালি জায়গাটা অনুভব করি। প্রতিটি মুহূর্তে তুমি আছ, অথচ তুমি নেই। এই বৈপরীত্যটা আমাকে পাগল করে দেয়। কিন্তু আমি পাগল হই না, কারণ আমি শক্ত। তুমি আমাকে শক্ত বানিয়ে দিয়ে গেছ, এটা তোমার অজান্তে দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার। আমি সেই উপহারটা বুকে ধরে রেখে প্রতিদিনের যুদ্ধে জিতে যাচ্ছি। ৩৭. কান্না আমার ভাষা হয়ে গেছে কান্না আমার ভাষা হয়ে গেছে, কথা দিয়ে আর প্রকাশ করতে পারি না। যখন কষ্ট হয়, কাঁদি। যখন রাগ হয়, কাঁদি। যখন মনে পড়ে, কাঁদি। তুমি বলতে—কান্না দুর্বলতার চিহ্ন। আমি বলি—কান্না সাহসের চিহ্ন। কারণ কাঁদতে পারাটাও একটা শক্তি, সবাই পারে না। অনেকে কষ্ট চেপে রাখে, হাসির মুখোশ পরে ঘোরে। আমি সেটা পারি না, আমি কাঁদি—খোলামেলা, নির্ভয়ে। আমার কান্নায় কেউ অস্বস্তি বোধ করলে সেটা তার সমস্যা, আমার নয়। আমি কাঁদি কারণ আমি মানুষ, আর মানুষের কান্না স্বাভাবিক। তুমি আমাকে কাঁদতে শিখিয়েছ, এটা তোমার দেওয়া একমাত্র জিনিস যা আমি রেখে দিয়েছি। বাকি সব ফিরিয়ে দিয়েছি—স্মৃতি, উপহার, প্রতিশ্রুতি। কিন্তু কান্নাটা রেখে দিয়েছি, কারণ এটা আমার মুক্তির পথ। প্রতিটি কান্নার পর আমি একটু হালকা হই, একটু সুস্থ হই। ৩৮. তোমার ছবিটা উল্টে রেখেছি তোমার ছবিটা উল্টে রেখেছি টেবিলে, সোজা রাখার সাহস নেই। সোজা রাখলে তোমার চোখ দুটো আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই তাকানো আমাকে দুর্বল করে দেয়, আমি আবার পুরনো জায়গায় ফিরে যাই। তাই উল্টে রেখেছি—চোখের আড়ালে, মনের আড়ালে নয়। কারণ মন থেকে তোমাকে সরানো আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি এখনো। আমি চেষ্টা করছি, প্রতিদিন চেষ্টা করছি। কিন্তু মন একগুঁয়ে, সে তোমাকে ছাড়তে রাজি নয়। আমি মনকে বলি—ছাড়ো, সে আর আসবে না। মন বলে—জানি, তবুও ছাড়ব না। এই টানাটানিতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। একদিন হয়তো মন হেরে যাবে, আমি জিতব। সেদিন তোমার ছবিটা আমি ড্রয়ারে রেখে দেব, চিরকালের জন্য। ৩৯. পৃথিবী সুন্দর তবুও একা পৃথিবী সুন্দর, তবুও আমি একা—এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। চারপাশে মানুষ, গাছ, পাখি, ফুল—সবকিছু আছে। কিন্তু সেই একটা মানুষ নেই, যার সাথে এই সৌন্দর্য ভাগ করে নেব। একা একা সুন্দর জিনিস দেখলে মনটা আরও খারাপ হয়। মনে হয়—এই সৌন্দর্যটা তোমার সাথে দেখলে কত ভালো লাগত! কিন্তু তুমি নেই, তাই সৌন্দর্যটাও যেন ম্লান হয়ে যায়। আমি জানি এটা আমার মনের সমস্যা, পৃথিবীর নয়। পৃথিবী তার নিজের নিয়মে সুন্দর, আমার মন খারাপে তার কিছু যায়-আসে না। তবুও আমি চাই কেউ আমার পাশে থাকুক, আমার সাথে এই পৃথিবীটা দেখুক। সেই কেউ তুমি না হলেও চলবে, শুধু কেউ একজন হলেই হবে। কিন্তু আমি আর তাড়াহুড়ো করব না, আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। তিনি যখন চাইবেন, তখনই সেই মানুষটাকে পাঠাবেন আমার জীবনে। ৪০. ক্ষমা করে দিলাম তোমাকে আজ ক্ষমা করে দিলাম তোমাকে আজ, কারণ ক্ষমা না করলে আমিই কষ্ট পাব। রাগ ধরে রাখা মানে নিজের হাতে জ্বলন্ত কয়লা ধরে রাখা—পোড়ে তো নিজেই। আমি অনেকদিন সেই কয়লা ধরে রেখেছিলাম, হাত পুড়ে গেছে। এখন ছেড়ে দিলাম, কারণ আর পোড়ার শক্তি নেই। তুমি যা করেছ, তার জন্য তোমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। আমি তোমার বিচারক নই, আমি শুধু একজন মানুষ যে কষ্ট পেয়েছে। ক্ষমা করে দেওয়া মানে ভুলে যাওয়া নয়, ক্ষমা করে দেওয়া মানে মুক্ত হওয়া। আমি আজ মুক্ত হলাম তোমার থেকে, তোমার স্মৃতি থেকে, তোমার কষ্ট থেকে। এই মুক্তিটা আমার অনেক দিন আগেই দরকার ছিল, কিন্তু আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আজ আমি প্রস্তুত, আজ আমি ক্ষমা করছি। তোমার জন্য নয়, নিজের জন্য। কারণ আমি আর এই কষ্টের বোঝা বহন করতে চাই না, আমি হালকা হতে চাই। ৪১. শীতের রাতে তোমার কম্বল শীতের রাতে তোমার ফেলে যাওয়া কম্বলটা গায়ে দিই। তোমার উষ্ণতা নেই সেখানে, কিন্তু তোমার স্মৃতি আছে। সেই কম্বলটা জড়িয়ে ধরলে মনে হয় তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছ। কী হাস্যকর—একটা কম্বলের কাছে সান্ত্বনা খুঁজছি! কিন্তু মানুষ যখন একা হয়ে যায়, তখন জড় বস্তুও প্রিয় হয়ে ওঠে। তোমার ফেলে যাওয়া জিনিসগুলো আমি সযত্নে রেখে দিয়েছি। তোমার কফির মগ, তোমার বই, তোমার সেই নীল শার্টটা। প্রতিটি জিনিসে তোমার ছোঁয়া আছে, আমি সেই ছোঁয়া অনুভব করি। মানুষ বলে—ফেলে দাও, এসব রেখে কী হবে? আমি বলি—এগুলো ফেলে দিলে তোমার শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যাবে। আমি এখনো প্রস্তুত নই সেটার জন্য, একদিন হয়তো হব। সেদিন এই কম্বলটাও ভাঁজ করে রেখে দেব আলমারির কোণে, চিরকালের জন্য। ৪২. তোমার কণ্ঠস্বর ভুলে যাচ্ছি তোমার কণ্ঠস্বর ভুলে যাচ্ছি ধীরে ধীরে, এটা আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। আগে চোখ বন্ধ করলে তোমার কণ্ঠ স্পষ্ট শুনতে পেতাম। এখন সেটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, যেন দূর থেকে কেউ ডাকছে। আমি ভয় পাচ্ছি—একদিন কি তোমার কণ্ঠ পুরোপুরি ভুলে যাব? তোমার হাসির ধরন, তোমার রাগের স্বর, তোমার ভালোবাসার ফিসফিস—সব কি মুছে যাবে? সময় নিষ্ঠুর, সে সবকিছু মুছে দেয়। আমি চাইনি তোমাকে ভুলতে, কিন্তু সময় জোর করে ভুলিয়ে দিচ্ছে। এটা কি ভালো না খারাপ, আমি জানি না। হয়তো ভালো, কারণ ভুলে গেলে কষ্ট কমবে। হয়তো খারাপ, কারণ ভুলে গেলে তুমি সত্যিই মরে যাবে আমার ভেতর থেকে। আমি এই দ্বিধায় আটকে আছি—ভুলব নাকি মনে রাখব? সময় হয়তো আমার হয়ে এই সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেবে, আমাকে আর ভাবতে হবে না। ৪৩. আব্বুর কাঁধে মাথা রেখে আব্বুর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে ইচ্ছে করে, কিন্তু পারি না। কারণ আব্বু দেখলে চিন্তা করবেন, আর আব্বুকে চিন্তায় ফেলতে চাই না। তিনি সারাজীবন আমার জন্য কষ্ট করেছেন, আমার সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছেন। আমি কীভাবে তাঁকে বলব—আব্বু, আমি খুব কষ্টে আছি? তিনি তো সেই কষ্ট সহ্য করতে পারবেন না, তাঁর বুকটা ভেঙে যাবে। তাই আমি চুপ করে থাকি, হাসি দিই, ভালো আছি বলি। আব্বু বিশ্বাস করেন, কারণ তিনি আমাকে বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাসটা ভাঙতে আমার মন সায় দেয় না। আমি একা একা সামলাব, আব্বুকে কষ্ট দেব না। এটাই আমার সন্তান হিসেবে দায়িত্ব—বাবা-মাকে সুখে রাখা। তাঁরা আমার জন্য যা করেছেন, তার বিনিময়ে আমি অন্তত এটুকু করতে পারি। আল্লাহ, আমার আব্বুকে সুস্থ রাখো, তাঁকে কোনোদিন আমার কষ্টের কথা জানতে দিয়ো না। ৪৪. প্রতিটি সম্পর্কের একটা মেয়াদ প্রতিটি সম্পর্কের একটা মেয়াদ থাকে, কিছু দীর্ঘ, কিছু ক্ষণস্থায়ী। আমাদের সম্পর্কটা ক্ষণস্থায়ী ছিল, কিন্তু তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। তুমি অল্প সময়ের জন্য এসেছিলে, কিন্তু সারাজীবনের দাগ রেখে গেছ। সেই দাগ কোনোদিন মুছবে না, আমি জানি। কিন্তু আমি সেই দাগ নিয়েই বাঁচতে শিখব, কারণ এটাই আমার বাস্তবতা। মানুষ বলে—সময় সব ক্ষত সারায়। আমি বলি—সময় ক্ষত সারায় না, সহ্য করতে শেখায়। আমি সহ্য করতে শিখেছি, এটাই আমার অর্জন। তোমাকে না পাওয়ার কষ্টটা এখনো আছে, কিন্তু আমি সেটা সামলাতে পারি। আগে পারতাম না, এখন পারি—এটাই পার্থক্য। আমি এগিয়ে যাচ্ছি, ধীরে কিন্তু স্থিরভাবে। তোমার স্মৃতি আমার সাথে আছে, কিন্তু সে আর আমাকে টানছে না পেছনে। আমি তাকে সাথে নিয়েই সামনে হাঁটছি, এটাই আমার নতুন যাত্রা। ৪৫. একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম তোমাকে, কিন্তু সাহস পাইনি। সেই কথাটা ছিল—আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি, কিন্তু ভুলতে পারিনি। ক্ষমা আর ভুলে যাওয়া দুটো আলাদা জিনিস, মানুষ প্রায়ই গুলিয়ে ফেলে। আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি, কারণ রাগ ধরে রাখা আমার জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু ভুলতে পারিনি, কারণ তুমি আমার জীবনের একটা বড় অংশ ছিলে। বড় অংশকে ভুলে যাওয়া সহজ নয়, সময় লাগে। আমি সেই সময়টা নিচ্ছি, তাড়াহুড়ো করছি না। একদিন হয়তো তোমার মুখটা মনে করতে গিয়ে পারব না। সেদিন আমি জানব—আমি সত্যিই ভুলে গেছি। কিন্তু আজ সেই দিন নয়, আজ তোমার মুখটা এখনো স্পষ্ট। তোমার চোখ, তোমার হাসি, তোমার রাগী মুখ—সব মনে আছে। একদিন এই স্পষ্টতা ঝাপসা হয়ে যাবে, আমি সেই দিনের জন্য ধৈর্য ধরে আছি। ৪৬. আমি আর আগের মানুষ নই আমি আর আগের মানুষ নই, তুমি আমাকে বদলে দিয়ে গেছ। আগে আমি সবাইকে বিশ্বাস করতাম, এখন কাউকে করি না। আগে আমি সহজে ভালোবাসতাম, এখন ভালোবাসতে ভয় পাই। আগে আমি মানুষের কথায় সহজে কষ্ট পেতাম, এখন পাই না। তুমি আমাকে পাথর বানিয়ে দিয়ে গেছ, যে পাথরে কিছুই লাগে না। এটা ভালো না খারাপ, আমি জানি না। হয়তো ভালো, কারণ আমি আর কষ্ট পাই না। হয়তো খারাপ, কারণ আমি আর আনন্দও পাই না। আমি এখন একটা যন্ত্রের মতো—খাই, ঘুমাই, কাজ করি। অনুভূতি নেই, আবেগ নেই, প্রত্যাশা নেই। এই জীবনটা কি জীবন? নাকি এটা শুধু বেঁচে থাকা? আমি জানি না, শুধু জানি—তুমি আমার কাছ থেকে জীবনটা কেড়ে নিয়ে গেছ, বেঁচে থাকাটা রেখে গেছ। ৪৭. দোয়ায় তোমার নাম আসে দোয়ায় তোমার নাম আসে, আমি সরিয়ে দিতে পারি না। আল্লাহর কাছে হাত তুললে প্রথমেই তোমার মঙ্গল চাই। এটা আমার দুর্বলতা নাকি মহত্ত্ব, সেটা আমি জানি না। শুধু জানি—যাকে একবার সত্যিকারের ভালোবেসেছি, তার জন্য দোয়া করা বন্ধ করতে পারি না। তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ, সত্য। তুমি আমাকে ছেড়ে গেছ, সত্য। কিন্তু তুমি আমার জীবনে একটা সময় সুখ দিয়েছিলে, সেটাও তো সত্য। সেই সুখের বিনিময়ে আমি তোমার জন্য দোয়া করি। আল্লাহ তোমাকে হেদায়েত দিন, তোমাকে সঠিক পথে রাখুন। তোমার জীবনে যেন বরকত থাকে, তোমার পরিবার যেন সুখে থাকে। এই দোয়াগুলো আমি সত্যি মন থেকে করি, কোনো দেখানো নয়। কারণ ইসলাম আমাকে শিখিয়েছে—শত্রুর জন্যও দোয়া করো। তুমি আমার শত্রু নও, তুমি শুধু আমার অতীত। ৪৮. একটা রাস্তা দুভাগ হয়ে একটা রাস্তা দুভাগ হয়ে গেল, তুমি ডানে গেলে, আমি বামে। আমরা দুজনেই জানতাম এই মোড়টা আসবে, তবুও প্রস্তুত ছিলাম না। বিদায়ের মুহূর্তে তোমার চোখে জল দেখেছিলাম, নাকি সেটা আমার কল্পনা ছিল? আমি জানি না, জানতেও চাই না। কারণ জানলে আবার দুর্বল হয়ে পড়ব, আবার ফিরে যেতে চাইব। আমি ফিরে যেতে চাই না, কারণ পেছনে কিছু নেই। সামনে কী আছে জানি না, কিন্তু পেছনের চেয়ে ভালো হবে—এই বিশ্বাস আমার আছে। আমি আমার রাস্তায় হাঁটছি, তুমি তোমার রাস্তায়। দুটো রাস্তা হয়তো কোনোদিন আর মিলবে না। কিন্তু সেই মোড়টার কথা আমি মনে রাখব, যেখানে আমরা শেষবার একসাথে ছিলাম। সেই মোড়টাই আমাদের গল্পের শেষ পাতা। বইটা বন্ধ হয়ে গেছে, নতুন বই শুরু হবে—আলাদা আলাদা। ৪৯. আমি শিখেছি একা হাঁটতে আমি শিখেছি একা হাঁটতে, এটা তোমার দেওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আগে তোমার হাত ধরে হাঁটতাম, মনে হতো পৃথিবীটা আমার। এখন একা হাঁটি, মনে হয় পৃথিবীটা আমার বিরুদ্ধে। কিন্তু আমি হাঁটা বন্ধ করিনি, কারণ হাঁটা বন্ধ করলে আমি শেষ। প্রতিটি পদক্ষেপ কঠিন, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপ আমাকে শক্ত করছে। আমি এখন জানি—একা হাঁটাটাই আসল হাঁটা। কারও সাথে হাঁটলে তুমি তার গতিতে চলো, একা হাঁটলে তুমি নিজের গতিতে চলো। আমি এখন নিজের গতিতে চলছি, কারও জন্য দাঁড়াচ্ছি না। এই স্বাধীনতাটা আমার কাছে নতুন, কিন্তু আমি এটাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি। একা হাঁটতে হাঁটতে আমি নিজেকে চিনছি, নিজের শক্তি বুঝছি। তোমার সাথে থাকলে এই চেনাটা হতো না, এই বোঝাটা হতো না। তাই তোমাকে ধন্যবাদ—আমাকে একা করে দেওয়ার জন্য, আমাকে শক্ত করে দেওয়ার জন্য। ৫০. শেষ কথা বলে শেষ হয় না শেষ কথা বলে কিছু শেষ হয় না, কিছু কিছু জিনিস চিরকাল থেকে যায়। তোমার সাথে আমার গল্পটা শেষ হয়েছে, কিন্তু তোমার প্রভাব শেষ হয়নি। তুমি আমাকে যা শিখিয়েছ—ভালো হোক, খারাপ হোক—সেটা আমার সাথে থাকবে। আমি তোমাকে মনে রাখব, কিন্তু আটকে থাকব না। মনে রাখা আর আটকে থাকা দুটো আলাদা জিনিস। আমি মনে রাখব সেই সুন্দর দিনগুলো, ভুলে যাব কষ্টের রাতগুলো। আমি মনে রাখব তোমার ভালো দিকগুলো, ক্ষমা করে দেব খারাপ দিকগুলো। এটাই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, এটাই আমার বিদায়। আমি এখন সামনে তাকাচ্ছি, পেছনে নয়। সামনে কী আছে জানি না, কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা আছে। তিনি আমার জন্য যা রেখেছেন, সেটা নিশ্চয়ই সুন্দর। আমি সেই সুন্দরের অপেক্ষায় আছি, ধৈর্য ধরে, বিশ্বাস নিয়ে, আর একটু একটু করে সুস্থ হতে হতে। অন্ধকার আমার ভীষণ প্রিয়, তবু রাত আমার সঙ্গে বেঈমানি করে। অভিনয় করে হলেও দিন আমাকে হাসায়, আর রাত আমাকে যত্ন করে কাঁদায়। ___

লেখক:

সব লেখা পড়ুন | হোম পেজে ফিরুন