মাহবুব সরদার সবুজ | Mahbub Sardar Sabuj

অপেক্ষায় রাখা চিঠি

গল্প |

শহরের সবচেয়ে পুরোনো ডাকঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আকাশটা আজ অদ্ভুত রকম মেঘলা। হাতে একটা হলদেটে হয়ে যাওয়া খাম, যার কিনারাগুলো সময়ের ভারে কিছুটা ক্ষয়ে গেছে। ঠিক পঁচিশ বছর আগে এই খামটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিল সে। বলেছিল, "যেদিন মনে হবে আমাকে আর একটুও ভালোবাসো না, ঠিক সেদিন এই চিঠিটা খুলে পড়বে। তার আগে কোনোভাবেই নয়।" পঁচিশটা বছর কেটে গেছে। ওর দেওয়া কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। ভালোবাসার কমতি তো হয়নি, বরং সময়ের সাথে তা আরো গভীর হয়েছে। কিন্তু আজ, ওর মৃত্যুর ঠিক এক মাস পর, আমার মনে হলো চিঠিটা পড়া উচিত। কারণ, মৃত্যু হয়তো সেই শর্তটাকে অন্যভাবে পূরণ করে দিয়েছে। খামটা খুলতেই একটা পুরোনো, পরিচিত সুগন্ধি আমার নাকে এসে লাগলো। ওর গায়ের সেই পরিচিত গন্ধ। বৃষ্টিভেজা মাটির সাথে মেশানো হাসনাহেনার মতো। চিঠির কাগজটা সযত্নে ভাঁজ করা। আমার আঙুল কাঁপছিল। আমি আস্তে করে ভাঁজ খুললাম। "প্রিয় জাদুকর, তুমি যখন এই চিঠিটা পড়ছো, আমি জানি আমি আর তোমার পাশে নেই। তুমি হয়তো ভাবছো, আমি কেন বলেছিলাম যেদিন আমাকে আর ভালোবাসবে না, সেদিন চিঠিটা পড়তে। কারণ আমি জানতাম, তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসা বন্ধ করবে না। আর আমি চেয়েছিলাম, আমার মৃত্যুর পর তুমি এই চিঠিটা পড়ো। তুমি যেন বুঝতে পারো, তোমার ভালোবাসার জোর কতটা ছিল, যা আমাকে আজীবন বাঁচিয়ে রেখেছিল। জানো, যেদিন প্রথম তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছিল, সেদিন তুমি একটা গাঢ় নীল শার্ট পরেছিলে। আর আমি পরেছিলাম একটা সাধারণ অফ হোয়াইট শাড়ি। তুমি আমার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হেসেছিলে, যেন আমি তোমার কত জন্মের চেনা। সেই হাসিতেই আমি আমার পুরো পৃথিবীটা নিঃশব্দে তোমার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। তুমি সব সময় বলতে, আমার ভালোবাসা তোমার জন্য একটা বিশাল সমুদ্রের মতো, যার কোনো কূল নেই, শেষ নেই। কিন্তু আমি কখনো তোমাকে বলিনি, আমার ভালোবাসা তোমার জন্য একটা ছোট্ট দ্বীপের মতো। সেই দ্বীপে শুধু তুমি আর আমি ছাড়া আর কারো জায়গা নেই, যেখানে সমুদ্রের সব ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে, কিন্তু দ্বীপটাকে কখনো ডুবিয়ে দিতে পারে না। আমাদের সংসারটা খুব সাধারণ ছিল। তুমি অফিসে যেতে, আমি তোমার ফেরার অপেক্ষায় থাকতাম। তুমি ফিরে এলে আমরা বারান্দায় বসে একসাথে চা খেতাম। কিন্তু এই সাধারণ জীবনের মধ্যেই যে কত অসাধারণ মুহূর্ত লুকিয়ে ছিল, তা আমি এখন বুঝতে পারি। মনে আছে, একবার আমাদের খুব ঝগড়া হয়েছিল। তুমি অভিমান করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলে। আমি সারা রাত কেঁদেছিলাম। পরদিন সকালে তুমি ফিরে এসে আমার হাতে একটা বেলিফুলের মালা দিয়েছিলে আর বলেছিলে, আমি রাগ করতে পারি, কিন্তু তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারি না। সেই বেলিফুলের মালাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কিন্তু আমি এখনো আমার ডায়েরির ভাঁজে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছি। তুমি সব সময় আমার খেয়াল রাখতে। আমার একটু জ্বর হলেই তুমি সারা রাত জেগে আমার মাথায় জলপট্টি দিতে। আমার একটু মন খারাপ হলে তুমি আমাকে হাসানোর জন্য কত কীই না করতে। তোমার এই পাগলামিগুলোই আমাকে বারবার তোমার প্রেমে ফেলেছে। জানো জাদুকর, আমি জানি তুমি এখন খুব একা বোধ করছো। সবাই হয়তো তোমাকে বলবে শোক ভুলে নতুন করে বাঁচতে। কিন্তু আমি তা বলবো না। আমি চাই তুমি আমার স্মৃতিগুলোকে সযত্নে লালন করো। আমি চাই আমাদের কাটানো মুহূর্তগুলো তোমার ঠোঁটের কোণে হাসি হয়ে বেঁচে থাকুক, চোখের জল হয়ে নয়। তুমি যখন একা হাঁটবে, ভাববে তোমার ছায়ার পাশেই আমার ছায়াটা হাঁটছে। আমার একটা শেষ অনুরোধ আছে তোমার কাছে। আমাদের সেই পুরোনো ক্যাফেতে যাবে? যেখানে আমরা প্রথমবার কফি খেয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে আমার জন্য এক কাপ ব্ল্যাক কফি অর্ডার করবে। উল্টোদিকের খালি চেয়ারটায় আমি থাকবো। হয়তো আমাদের কোনো কথা হবে না, কিন্তু তুমি তো জানো, আমাদের নীরবতাও কত গল্প বলতে পারতো। আমি হয়তো শারীরিকভাবে তোমার পাশে নেই, কিন্তু আমার ভালোবাসা সব সময় তোমার সাথেই থাকবে। তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে, তোমার প্রতিটা পদক্ষেপে আমি আছি। ভালো থেকো, আমার জাদুকর। আর হ্যাঁ, আমাকে একটুও ভুলবে না কিন্তু। ইতি তোমার মেঘবালিকা" চিঠিটা পড়া শেষ করে আমি ডাকঘরের সিঁড়িতে বসে পড়লাম। চোখের জল আর বাধা মানলো না। পঁচিশ বছর পর আজ আবার মনে হলো, ও আমার পাশেই আছে। ওর সেই পুরোনো সুগন্ধিটা যেন আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম। চোখ মুছে সেই পুরোনো ক্যাফের দিকে পা বাড়ালাম। আজ আমি ওর জন্য এক কাপ ব্ল্যাক কফি অর্ডার করবো। আর মনে করবো, ও আমার সামনেই বসে আছে। কারণ, আমাদের ভালোবাসা তো কোনো দিন শেষ হওয়ার নয়। আমি তো ওর জাদুকর, আর ও আমার মেঘবালিকা।

লেখক:

সব লেখা পড়ুন | হোম পেজে ফিরুন